এতে বিশ্বজুড়ে কৃষিপণ্যের উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৫০ সালের পর চলতি বছরের এল নিনো অন্যতম শক্তিশালী রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে। এতে বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকট ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
কফি, কোকো, চিনি ও পাম তেলের মতো বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া প্রধান কৃষিপণ্যগুলোর দাম এরই মধ্যে রেকর্ড হারে বাড়তে শুরু করেছে। সাধারণত দুই-সাত বছর পর পর প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর কারণে বিশ্বের কোনো অঞ্চলে চরম খরা, আবার কোনো অঞ্চলে দেখা দেয় অতিবৃষ্টি। এর প্রভাবে দক্ষিণ আমেরিকা, পশ্চিম আফ্রিকা থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন শস্যের চাষাবাদ চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অ্যারাবিকা কফির দাম গত জুনের শুরু থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে প্রতি পাউন্ড ৩ ডলার ১৯ সেন্টে পৌঁছেছে। এটি কফির বাজারে গত ৪৭ বছরের মধ্যে একদিনে সবচেয়ে বড় দরবৃদ্ধির ঘটনা। অন্যদিকে কোকোর দামও গত দুই মাসে প্রায় ৪০-৬৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার রেকর্ড গড়েছে। দরপত্রের বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান রাবোব্যাংকের মতে, বাজার চাহিদার চেয়ে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি বিবেচনা করেই এসব পণ্যে অতিরিক্ত দর বাড়াচ্ছেন।
মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা এনওএএ জানিয়েছে, এ বছরের শেষ নাগাদ এল নিনো চরম রূপ ধারণ করার সম্ভাবনা রয়েছে ৮১ শতাংশ। ২০২৭ সালের মে মাস বা বসন্ত পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ৯৭ শতাংশ। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) হিসাব অনুযায়ী, একটি শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম গড়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। তবে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের তীব্র সংকটের কারণে এবার মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব আরো অনেক বেশি হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে বলেছে, এ জলবায়ু বিপর্যয়ের ফলে আগামী বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বের অন্তত ৪ কোটি ৯০ লাখ মানুষ নতুন করে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাও (এফএও) উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, আবহাওয়ার প্রভাব এবং সার সংকটের কারণে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় রফতানিকারক দেশে গম ও চালের ফলন ব্যাহত হলে বিশ্বব্যাপী এক ভয়ানক বিপর্যয় তৈরি হবে।
একইভাবে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় পাম অয়েল এবং এশীয় অঞ্চলে চিনির উৎপাদন কমে গেলে সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, অনেক দেশ নিজেদের খাদ্য মজুদ নিশ্চিত করতে রফতানি বন্ধ করে দিলে বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের তীব্রতা আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।